২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে সেনাবাহিনী যখন ব্রিগেডিয়ার আজমির অপহরণ পরীক্ষার জন্য একটি কোর্ট অব ইনকোয়ারি গঠন করে, ঠিক সে সময়ই র্যাবের বিরুদ্ধে ওঠা বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুমের অভিযোগটি তদন্ত করতেও সেনাবাহিনীর একটি অভ্যন্তরীণ বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই বোর্ড কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছেই পরবর্তী সময়ে রহস্যজনকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ গত ৪ জানুয়ারি ‘জোরপূর্বক গুম সম্পর্কিত তদন্ত কমিশন’ প্রধান উপদেষ্টার কাছে যে প্রতিবেদন জমা দেয়, তাতেই এ চিত্র উঠে আসে।
গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানের নেতৃত্বাধীন বোর্ডে সদস্য ছিলেন মেজর জেনারেল ইফতেখার আনিস, মেজর জেনারেল নাহিদ আসগর, ব্রিগেডিয়ার মনওয়ার হোসেন খান, ব্রিগেডিয়ার আবদুর রহমান ও ব্রিগেডিয়ার আসিফ ইকবাল। একই সময় দুর্নীতি তদন্তের জন্য তৃতীয় একটি অভ্যন্তরীণ বোর্ডও গঠন করা হয়। ওই বোর্ডের চেয়ারম্যান লে. জেনারেল মিজানুর রহমান শামীম কমিশনকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, র্যাব-সংক্রান্ত বোর্ডটি প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে কাজ করে। এ সময় তারা প্রায় ৬০ কর্মকর্তা ও সৈনিকের সাক্ষাৎকার নেয়। একাধিক সাক্ষী পরে গুম-সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্ত কমিশনকে জানান, বোর্ডে তাদের জবানবন্দি আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড করা হয়েছিল। কেউ অডিও রেকর্ডার, কেউ ভিডিও ক্যামেরা, আবার কেউ লিখিত বিবৃতিতে স্বাক্ষরের কথা বলেছেন যা ওই তদন্ত চলার প্রমাণ।
গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার সময় (২০০৯-১৩) র্যাব-১-এর অধিনায়কের দায়িত্বে থাকা ব্রিগেডিয়ার রশিদুল আলম গুম কমিশনকে বলেন, ‘আমাকে ফোন করে ডাকা হয়েছিল। আমার কাছে মনে হয়েছিল এটি অফিসারদের একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং বোর্ড। তারা আমাকে শুধু লে. জেনারেল মুজিব সম্পর্কে আমি কী জানি এবং ইলিয়াস আলী মামলায় তার সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন করেছিল। এখানেও আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি মেজর জেনারেল জিয়ার (বর্তমানে গুমের অভিযোগে কারাগারে বন্দি) ইলিয়াস আলী মামলায় সম্পৃক্ততার সম্পূর্ণ বিবরণ তাদের দিতে। আমি একটি লিখিত বিবৃতি দিয়েছিলাম এবং বোর্ড সম্ভবত সেটি রেকর্ডও করেছিল।
তবে গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন জানায়, সেনাবাহিনীর ওই কমিশন বোর্ডের তৈরি কোনো রিপোর্টের সন্ধান পায়নি। যোগাযোগ করা হলে বোর্ডের চেয়ারম্যান কমিশনকে জানান, কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছেই বোর্ডটি বিলুপ্ত করা হয়েছিল। কমিশন তদন্ত চলাকালীন সংগৃহীত বিভিন্ন প্রমাণ দেখতে চাইলে জানানো হয়, সেগুলো আর পাওয়া যাচ্ছে না। এ বর্ণনার সত্যতা নিশ্চিত করেন সেনাবাহিনী সদর দপ্তরের অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল শাখার অধীন পার্সোনাল সার্ভিসেস ডাইরেক্টরেটের পরিচালক, যিনি কমিশনের ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
গুম-সংক্রান্ত কমিশন জানতে চেয়েছিল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত একটি তদন্ত বোর্ড সিদ্ধান্ত প্রকাশ না করেই বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং সংগৃহীত সব প্রমাণ পরবর্তীতে যা পাওয়া যায়নি। কমিশনকে জানানো হয়, এটিই একমাত্র এমন ঘটনা। বোর্ডটি কেন তার ম্যান্ডেট পূর্ণ করেনি—এ প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়, এটি ‘ঊর্ধ্বতনের আদেশে’ থেমে গিয়েছিল।
গুম-সংক্রান্ত চূড়ান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কমিশন লক্ষ করে একজন লেফটেন্যান্ট জেনারেলের নেতৃত্বাধীন বোর্ড বন্ধের নির্দেশ যেকোনো আদেশই অবশ্যই আরো উচ্চতর কর্তৃপক্ষ থেকে আসতে হয়েছে। বর্ণিত পরিস্থিতিতে এমন ক্ষমতা একমাত্র সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানেরই থাকতে পারে।’
কোন নিয়মের আওতায় নথিপত্র পরে আর হাতের নাগালে পাওয়া যায়নি—তা ব্যাখ্যা করার মতো কোনো নথিভুক্ত রেকর্ড আছে কি না জানতে চাইলে কমিশন কোনো ব্যাখ্যা পায়নি।
কমিশন বলছে, ‘যেসব সাক্ষী পরে কমিশনের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং এর আগে বোর্ডের সামনেও হাজির হয়েছিলেন, তারা জানিয়েছেন তারা নিজের চোখে দেখা জোরপূর্বক গুম ও নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে অন্তত একজন সৈনিক ছিলেন, যিনি বলেছেন তিনি সেই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন, যে অভিযানের সময় বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী অপহৃত হন। কমিশন এই প্রমাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের বলে মনে করে।’
এসব বিবেচনায় কমিশন সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে তদন্তের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছিল, প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছিল, এরপর কোনো ব্যাখ্যা বা ফলাফল ছাড়াই পুরো প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সংগৃহীত উপাদান পরবর্তীতে হারিয়ে যায় বা অনুপলব্ধ করা হয়। এমন আচরণ ‘অভ্যন্তরীণ তদন্ত স্বাধীনভাবে বা সদিচ্ছার সঙ্গে পরিচালিত হবে’—এই আস্থাকে গুরুতরভাবে দুর্বল করে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে শুধু অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করা যায় না—এই উপসংহারকে আরো জোরালো করে।
গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অভিযুক্ত অপরাধগুলো সেনা আইনের আওতায় পড়ে না এবং সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলো বারবার সন্দেহভাজনদের আটক করতে, প্রমাণ সংরক্ষণ করতে কিংবা সময়মতো ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে জবাবদিহি শুধু সামরিক আইন বা অভ্যন্তরীণ সামরিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত—এমন দাবির কোনো ভিত্তি নেই। এই বাস্তবতায় কোনো নিরাপত্তা বাহিনীর নিজস্ব প্রক্রিয়ার ওপর জবাবদিহি ছেড়ে দিলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’
বি: দ্র: প্রকাশিত সংবাদে কোন অভিযোগ ও লেখা পাঠাতে আমাদের ই-মেইলে যোগাযোগ করুন।