মোঃ আল আমিন গাজী,শ্যামনগর প্রতিনিধিঃদীর্ঘ তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার পর আগামীকাল মঙ্গলবার খুলছে সুন্দরবনের দুয়ার। মাছ ও কাঁকড়া আহরণের আশায় আবার বনের সরু নদীতে নৌকা নিয়ে নামবেন উপকূলের হাজার হাজার জেলে-বাওয়ালি। একই সঙ্গে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হবে সুন্দরবনের পর্যটন কেন্দ্রগুলো।
বন খোলার খবরে সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। তবে স্বস্তির পাশাপাশি জেলে-বাওয়ালীদের মনে রয়েছে দুশ্চিন্তা। তিন মাস আয় বন্ধ থাকায় তাদের ঋণের বোঝা বেড়েছে। তার ওপর সুন্দরবনে বনদস্যুদের হামলা ও চাঁদাবাজির আতঙ্কও তাড়া করে বেড়াচ্ছে। বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে সব ধরনের সম্পদ আহরণ বন্ধ রাখা হয়। একই সময়ে পর্যটকদের প্রবেশও নিষিদ্ধ ছিল।
এই নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় ধাক্কা গেছে সুন্দরবননির্ভর পরিবারগুলোর ওপর। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী, রমজাননগর, মুন্সীগঞ্জ, কৈখালী, নুরনগর, কাশিেমমারী, ঈশ্বরীপুর, ভুরুলিয়া ও গাবুরা এবং আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর, বড়দল, আনুলিয়া ও শ্রীউলা ইউনিয়নের বহু পরিবারে আয়-রোজগারের পথ এই সময়ে এক প্রকার বন্ধ ছিল। সংসার চালাতে অনেককে মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন নিতে হয়েছে। কেউ কেউ নিয়েছেন এনজিও ঋণ।
শ্যামনগরসংলগ্ন সুন্দরবনসংলগ্ন বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সীগঞ্জ ও গাবুরা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, জেলে-বাওয়ালীরা নৌকা ও জাল প্রস্তুত করছেন। দীর্ঘ দিন পড়ে থাকা নৌকায় কেউ আলকাতরা দিচ্ছেন, কেউ মেরামতের কাজ করছেন। ঘাটে ঘাটে চলছে জাল সেলাই এবং বন বিভাগের কাছ থেকে অনুমতিপত্র সংগ্রহের প্রস্তুতি।
বুড়িগোয়ালিনীর গ্রামের জেলে মাসুম বিল্লাহ জানান, তার পরিবারে সদস্য ছয়জন। সুন্দরবন বন্ধ থাকায় তার ঘরে চুলা জ্বালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এলাকায় অন্য কাজও নেই। তাই বাধ্য হয়ে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালিয়েছেন। জীবিকার তাগিদে নিষেধাজ্ঞার সময় গোপনে বনে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন মাসুম। কিন্তু বনদস্যুদের ভয় তাকে ওই ঝুঁকি নিতে দেয়নি। তিনি বলেন, 'এখন বন খোলার খবরে মনে হচ্ছে বুকে নতুন শ্বাস ফিরে পেয়েছি।'
একই এলাকার জেলে সাইদুর রহমান বলেন, সুন্দরবনের মাছ ও কাঁকড়া ধরে যাদের জীবন-জীবিকা চলে, তাদের জন্য তিন মাস ছিল অত্যন্ত কষ্টের। ঋরের বোঝা মাথায় নিয়ে দিন গুনেছি। বন খুললে আবার নৌকা নিয়ে যেতে পারব। কষ্ট করে আয় করে ঋণ শোধের চেষ্টা করব—এটিই এখন আমাদের বড় প্রত্যাশা।
পর্যটনসংলগ্ন ব্যবসায়ীরাও তিন মাস পর আবার কাজে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পর্যটকদের বহনকারী ট্রলারগুলো ধুয়েমুছে সাজানো হচ্ছে। কোথাও চলছে মেরামতের কাজ, কোথাও নতুন করে সাজানো হচ্ছে নৌযান।
ট্রলার মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম বলেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে গত তিন মাসে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার ট্রলার শ্রমিক কার্যত বেকার ছিলেন। ১ সেপ্টেম্বর থেকে জেলে-বাওয়ালীদের পাশাপাশি পর্যটকরাও সুন্দরবনে যেতে পারবেন। এতে আবার কাজের সুযোগ তৈরি হবে।
সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মীর হোসাইন বলেন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে সব ধরনের সম্পদ আহরণ এবং পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়েছিল।
সুন্দরবনের দুয়ার খুলছে। নদীর ঘাটে তাই এখন নৌকা মেরামতের শব্দ, জাল সেলাইয়ের ব্যস্ততা আর নতুন করে স্বপ্ন দেখার প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু সে স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঋণের কিস্তি, অনিশ্চিত আহরণ এবং বনদস্যুর ভয়।
বি: দ্র: প্রকাশিত সংবাদে কোন অভিযোগ ও লেখা পাঠাতে আমাদের ই-মেইলে যোগাযোগ করুন।