মোঃ আল আমিন গাজী,শ্যামনগর প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বন নির্ভর জনপদে মধু আহরণ মৌয়ালদের একটি প্রধান জীবিকা। বিশেষ করে সুন্দরবন এলাকায় মৌসুম এলেই শত শত মৌয়াল বন থেকে প্রাকৃতিক মধু সংগ্রহের প্রস্তুতি নেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরা রেঞ্জের মৌয়ালদের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে মধু না দিলে মধু আহরণের অনুমতি পাওয়া যায় না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাতক্ষীরা রেঞ্জের কোবাদক, বুড়িগোয়ালিনী, কদমতলা, কৈখালী স্টেশনের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা তথাকথিত বন বিভাগের চিহ্নিত দালাল নামে পরিচিত কোবাদক স্টেশনের মাসুম ঢালী, বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের ইসমাইল সানা, জালাল মোল্লা,শহিদুল মোল্লা, কদমতলা স্টেশনের আকবর আলি, আমজাদ হোসেন,কৈখালী স্টেশনে শহীদুল ইসলাম, বুলবুল হোসেনের মাধ্যমে মৌয়ালদের কাছ থেকে সরকারি রেভিনিউ ছাড়া অতিরিক্ত মাথাপিছু ৫০০ গ্রাম করে ঘুষ হিসাবে মধু নিয়ে থাকে। এছাড়া মৌয়ালদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে দ্রুত অনুমতি পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই মধুর ভাগ বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দপ্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায় বলে গোপন সূত্রে জানান বনবিভাগের এক কর্মকর্তা।
শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ, গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী এলাকার মৌয়াল নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সাতক্ষীরা রেঞ্জের স্টেশন গুলোতে সরকারি নিয়মে আবেদন করলেও অনেক সময় পাশ আটকে থাকে। পরে বন বিভাগের চিহ্নিত দালালদের মাধ্যমে মৌয়ালদের জনপ্রতি নির্দিষ্ট পরিমাণ মধু দিয়ে যোগাযোগ করলে দ্রুত অনুমতি মেলে। সরকারি রেভিনিউর পাশাপাশি অতিরিক্ত মধু দেওয়ার এই প্রক্রিয়ায় অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের চাপ তৈরি হয় মৌয়ালদের জন্য বড় বোঝা।
শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ চুনকুড়ি এলাকার কয়েকজন মৌয়ালের সাথে কথা বলে জানা যায়, বন বিভাগের কদমতলা স্টেশন থেকে হরিনগর আকবর দালালের মাধ্যমে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী জনপ্রতি ১৩০০ টাকা পাস করি তারপরও পাস আটকে রাখে। জনপ্রতি ৫০০ গ্রাম মধু দালালদের মাধ্যমে না দেওয়া পর্যন্ত পাস দেয় না। আকবার দালাল আমাদের বলে জনপ্রতি ৫০০ গ্রাম মধু না দিলে বনবিভাগ পাশ দেবে না এছাড়া বন- পরিবেশ প্রতিমন্ত্রীর জন্য মধু পাঠানো লাগবে তাই বলে আমাদের কাছ থেকে ৫০০ গ্রাম করে মধু নিয়েছে। প্রতিবার পাস করার সময় এই মধু দিতে হয়।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর পহেলা এপ্রিল থেকে ১১ শত কুইন্টাল মধু ৬ শত কুইন্টাল মোমের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ১৫৫ টি পাসে ১ হাজার ৪৭ জন মৌয়াল মধু আহরণে সুন্দরবনে যায়। এখনো পর্যন্ত ৫২৩ শত কুইন্টাল মধু ও ১৫৭ শত কুইন্টাল মোম আহরণ করেছে মৌয়ালরা।
বন বিভাগের দালাল আকবার আলীর কাছে সরকারি রেভিনিউ ছাড়া মৌয়ালদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মধু নেওয়ার বিষয় স্বীকার করে বলেন জনপ্রতি ৫০০ গ্রাম কর করে মধু দাবী করলে অনেক মৌয়াল ২ থেকে ৩০০ গ্রাম করে মধু দিচ্ছে। এ মধু গুলো মৌয়ালদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে স্টেশন অফিসে দেই এরপর স্যারেরা কি করে আমি আর খোঁজ রাখি না।
পরিবেশ ও বন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, এ ধরনের দুর্নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে। অনুমতি প্রক্রিয়াকে আরও ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করা গেলে এই ধরনের অভিযোগ কমে আসবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে দালাল পরিহার করে সরাসরি বন বিভাগের সাথে যুক্ত করা জরুরি।
বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ মশিউর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সরকারি রেভিনিউ ছাড়া মৌয়ালদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মধু নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। বন বিভাগের কেউ যদি দালালদের মাধ্যমে মৌয়লদের কাছ থেকে মধু নেয় তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জে দালালদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বি: দ্র: প্রকাশিত সংবাদে কোন অভিযোগ ও লেখা পাঠাতে আমাদের ই-মেইলে যোগাযোগ করুন।