বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক নতুন অভিযাত্রায় এগিয়ে চলেছে। অর্থনীতি অবকাঠামো প্রযুক্তি শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের নানা সূচকে দেশ ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার সবচেয়ে বড় শক্তি যুবসমাজ যদি মাদকের করাল গ্রাসে আটকে পড়ে তবে সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তাই মাদকমুক্ত সমাজ গঠন কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয় এটি জাতীয় উন্নয়ন মানবসম্পদ রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত।
যুবকরাই একটি দেশের পরিবর্তনের অগ্রদূত। তাদের চিন্তা শ্রম মেধা ও নেতৃত্বই একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো বিভিন্ন সামাজিক অর্থনৈতিক ও পারিবারিক কারণে একশ্রেণির তরুণ আজ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। সীমান্তপথে মাদক চোরাচালান অসাধু চক্রের সক্রিয়তা বেকারত্ব হতাশা বন্ধুদের নেতিবাচক প্রভাব মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং বিনোদনের সুস্থ পরিবেশের অভাবএসব কারণ মাদক বিস্তারের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মাদকাসক্তি একজন মানুষের ব্যক্তিগত সমস্যা নয় এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। একজন মাদকাসক্ত ধীরে ধীরে তার শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা হারায় পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয় কর্মক্ষমতা নষ্ট হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়। চুরি ছিনতাই সন্ত্রাস পারিবারিক সহিংসতা এবং বিভিন্ন সামাজিক অপরাধের সঙ্গে মাদকের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে মাদকবিরোধী সংগ্রামকে শুধু পুলিশের অভিযান বা আইনি ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়।
এই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে দেশের যুবসমাজ। কারণ তরুণদের রয়েছে সাহস নেতৃত্বের ক্ষমতা এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার অসীম সম্ভাবনা। একজন সচেতন তরুণ নিজে মাদক থেকে দূরে থাকলে শুধু নিজের জীবনই রক্ষা করেন না তিনি তার বন্ধু সহপাঠী ও আশপাশের মানুষদেরও সঠিক পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন।
খেলাধুলা সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড মাদক প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠ সংরক্ষণ নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বিতর্ক সাহিত্যচর্চা ও বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রম তরুণদের ইতিবাচক চিন্তা ও নেতৃত্বের বিকাশ ঘটায়। যে সমাজে তরুণরা মাঠে বইয়ে ও সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকে সেই সমাজে
মাদকের বিস্তার তুলনামূলকভাবে কম হয়।
পরিবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নৈতিক শিক্ষামসময় দেওয়া এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা মাদক প্রতিরোধের কার্যকর উপায়। একইভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত মাদকবিরোধী আলোচনা সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সচেতনতা তৈরির শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। তরুণরা তথ্যনির্ভর প্রচারণা অনলাইন ক্যাম্পেইন ভিডিও পোস্টার এবং জনসচেতনতামূলক বার্তার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদককে আকর্ষণীয় বা স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন জনপ্রতিনিধি শিক্ষক অভিভাবক ধর্মীয় নেতা ক্রীড়া সংগঠক সাংস্কৃতিক কর্মী গণমাধ্যম এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া মাদকমুক্ত সমাজ গঠন সম্ভব নয়। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি কারিগরি শিক্ষা দক্ষতা উন্নয়ন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ এবং তরুণদের জন্য সুস্থ বিনোদনের পরিবেশ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে যারা ইতোমধ্যে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন তাদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। চিকিৎসা কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করলে অনেকেই নতুন জীবনে ফিরে আসতে পারবেন। সমাজের উচিত তাদের ঘৃণা নয় সুস্থ জীবনে ফিরে আসার সুযোগ করে দেওয়া।
পরিশেষে বলা যায় একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণদের চরিত্র মূল্যবোধ ও কর্মপ্রচেষ্টার ওপর। তাই আসুন আমরা সবাই মিলে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলি যেখানে মাদককে না এবং শিক্ষামখেলাধুলা সংস্কৃতি, মানবিকতা ও নৈতিকতাকে হ্যাঁ বলা হবে। আজকের সচেতন যুবসমাজই পারে আগামী দিনের বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধ ও মাদকমুক্ত রাষ্ট্রে পরিণত করতে। সেই পরিবর্তনের সূচনা হোক আমাদের নিজেদের থেকেই।
কলাম লেখক: কৃষিবিদ কৃষ্ণপদ পরমান্য (সার্ভেয়ার)
বি: দ্র: প্রকাশিত সংবাদে কোন অভিযোগ ও লেখা পাঠাতে আমাদের ই-মেইলে যোগাযোগ করুন।