নিজস্ব প্রতিবেদক ঃনির্জন মাঠের সড়কের পাশে খড়ের নিচে পড়ে ছিল অজ্ঞাত এক যুবকের অর্ধগলিত মরদেহ। পাশে ছিল শিয়ালের আনাগোনা। মরদেহ উদ্ধারের পর পাশে পড়ে থাকা স্যান্ডেল, হাতঘড়ি ও পরনের পোশাক দেখে পরিবারের সদস্যরা শনাক্ত করেন—মরদেহটি নিখোঁজ রাজা হোসেনের (২৫)।
এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার যুবককে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হলে তাঁদের মধ্যে রাজা হোসেনের বন্ধু রিফাছ হোসেন (২৬) হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলে দাবি করেছে পুলিশ। পরে তাঁকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। অপর তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, অনলাইন জুয়ায় বড় অঙ্কের টাকা হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন রিফাছ। ওই সংকট কাটাতে বন্ধু রাজা হোসেনের কাছ থেকে টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেন তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজাকে ডেকে নিয়ে মাদক সেবনের পর জাল বা নেটজাতীয় বস্তু দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে রাজার মোবাইল ফোন ব্যবহার করে তাঁর পরিবারের কাছে টাকা দাবি করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকাল সোয়া ৬টার দিকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার পিয়ারপুর ইউনিয়নের কামালপুর সাতবিল মাঠ এলাকায় ইট বিছানো সড়কের পাশ থেকে রাজা হোসেনের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয় কৃষক সানাউল্লাহ সকালে মাঠে যাওয়ার সময় সড়কের পাশে কয়েকটি শিয়ালকে একটি বস্তু ঘিরে টানাটানি করতে দেখেন। কাছে গেলে শিয়ালগুলো পালিয়ে যায়। পরে খড় ও ঘাসের নিচে এক যুবকের মরদেহ দেখতে পান তিনি। মরদেহের শরীরের বিভিন্ন অংশ শিয়ালে ক্ষতবিক্ষত করেছিল।
খবর পেয়ে দৌলতপুর থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরিচয় শনাক্ত ও হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে ঝিনাইদহ থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইমসিন টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে।
রাজা হোসেন সোমবার রাত থেকে নিখোঁজ ছিলেন। এ ঘটনায় তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে দৌলতপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলে প্রথমে তাঁদের মরদেহের কাছে যেতে বাধা দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। পরে মরদেহের পাশে পড়ে থাকা স্যান্ডেল, হাতঘড়ি ও পরনের পোশাক দেখে তাঁরা সেটি রাজা হোসেনের বলে শনাক্ত করেন।
রাজা হোসেন পিয়ারপুর ইউনিয়নের কামালপুর গ্রামের ইমাম আলীর ছেলে। রিফাছ হোসেন একই গ্রামের সফেদ হোসেনের ছেলে।
পুলিশ জানায়, মরদেহ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থল থেকে সন্দেহভাজন চার যুবককে হেফাজতে নেওয়া হয়। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। একপর্যায়ে রিফাছ হোসেনকে পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রিফাছের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, তিনি রাজা হোসেনের কাছ থেকেই অনলাইন জুয়া খেলা শেখেন। পরে নিজেও অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়েন এবং বড় অঙ্কের টাকা হারান। এতে আর্থিক সংকটে পড়ে রাজাকে অপহরণ করে তাঁর কাছ থেকে টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেন।
পুলিশের দাবি, পরিকল্পনা অনুযায়ী সোমবার রাজাকে ডেকে নেওয়া হয়। পরে তাঁরা একসঙ্গে মাদক সেবন করেন। একপর্যায়ে জাল বা নেটজাতীয় বস্তু দিয়ে শ্বাসরোধ করে রাজাকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর রাজার মোবাইল ফোন ব্যবহার করে তাঁর পরিবারের কাছে টাকা দাবি করা হয়।
পরে মরদেহটি টানতে টানতে ঘটনাস্থলের পাশে নিয়ে খড় ও ঘাস দিয়ে ঢেকে রাখা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। শিয়ালের টানাটানিতে মরদেহের কিছু অংশ খড়ের বাইরে বেরিয়ে এলে স্থানীয় কৃষকের নজরে পড়ে।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা ইমাম আলী বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। ওই মামলায় রিফাছ হোসেনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান বলেন, ‘মরদেহটি দুই দিনের পুরোনো হওয়ায় পচন ধরেছে। মুখমণ্ডলসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মরদেহ উদ্ধারের সময় চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদে একজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। অপর তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’
ভেড়ামারা-দৌলতপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, অনলাইন জুয়ায় টাকা হারানোর কারণে রিফাছ আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন। সেই টাকা জোগাড় করতে তিনি তাঁর বন্ধু রাজা হোসেনের কাছ থেকে টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেন। একপর্যায়ে রাজাকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রিফাছের দেওয়া তথ্য ও অন্যান্য আলামত যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
Design & Developed BY- zahidit.com
Leave a Reply