,

শ্যামনগরে বনবিভাগ ও সিএমসির সাথে জেলেদের মতবিনিময় সভা

শ্যামনগর প্রতিনিধিঃ সুন্দরবন কোয়ালিশন প্রকল্পের আওতায় CEDIO-এর বাস্তবায়নে বুড়িগোয়ালিনী ও মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের জেলেদের অংশগ্রহণে “কীটনাশক দিয়ে মাছ ধরা বন্ধে বন বিভাগের ভাবনা এবং এডিপি থেকে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি” শীর্ষক একটি মতবিনিময় সভা বুড়িগোয়ালিনী নীলডুমুর সিএমসি অফিসে অনুষ্ঠিত হয়। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কীটনাশক ব্যবহার করে মাছ ধরা বন্ধে বন বিভাগের পরিকল্পনা সম্পর্কে জেলে সম্প্রদায়ের জানাবোঝা এবং জেলেদের বাস্তব সমস্যা ও চাহিদা জানা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করার সম্ভাব্য উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করা হয়।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (ACF) মশিউর রহমান। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা মোঃ এরফান উদ্দীন, সিএমসি (CMC) কমিটির সদস্যবৃন্দ, বুড়িগোয়ালিনী ও মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের জেলে প্রতিনিধিগণ, CEDIO-এর যুব স্বেচ্ছাসেবকবৃন্দ এবং CEDIO-এর নির্বাহী পরিচালক জনাব গাজী আল ইমরান। সভায় বন বিভাগের কর্মকর্তারা সুন্দরবনে কীটনাশক দিয়ে মাছ ধরার ফলে মাছের প্রজনন, জলজ জীববৈচিত্র্য এবং বনজ সম্পদের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তারা জেলেদের পরিবেশবান্ধব ও আইনসম্মত উপায়ে মাছ আহরণে উৎসাহিত করেন এবং বন বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেন।

মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারী জেলেরা তাদের দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, বছরে প্রায় তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশের পাস বন্ধ থাকায় তাদের প্রধান আয়ের উৎস সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণ, সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং জীবিকা সংকটের কারণে বিকল্প কোনো পথ না থাকায় নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। তাই তারা এ সময়ের জন্য টেকসই বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান।

জেলেরা বিকল্প জীবিকার জন্য বিভিন্ন বাস্তবসম্মত প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। তারা কাঁকড়া সংগ্রহ ও বিপণনের জন্য কাঁকড়া পয়েন্ট স্থাপন, ভ্যান প্রদান, ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য মূলধন সহায়তা, চাল ও খাদ্যপণ্য ব্যবসা, ভ্রাম্যমাণ পানির ব্যবসা, মৌচাষ ও মধু সংগ্রহ-পরবর্তী প্যাকেজিং কার্যক্রম, লবণ-সহনশীল বীজ বিতরণ, হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালনসহ বিভিন্ন আয়বর্ধক উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি সহজ শর্তে সহজলভ্য ঋণ সুবিধা চালুর বিষয়ে তারা গুরুত্বারোপ করেন, যাতে মৌসুমি বেকারত্বের সময়ে বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়।

সভায় বিএলসি (BLC) কার্ড সংক্রান্ত বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। জেলেরা কার্ড নবায়ন (Renewal) প্রক্রিয়া সহজ করা, যোগ্য জেলেদের দ্রুত কার্ড প্রদান এবং কার্ডের মাধ্যমে সরকারি সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করেন। বন বিভাগের কর্মকর্তারা এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সমন্বয়ের আশ্বাস প্রদান করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।

CEDIO-এর নির্বাহী পরিচালক গাজী আল ইমরান সভায় বলেন, সুন্দরবন সংরক্ষণ এবং জেলেদের জীবিকা নিরাপত্তা একে অপরের পরিপূরক। তাই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি জেলেদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় বন বিভাগের উদ্যোগে জেলেদের জন্য নিয়মিত মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনার প্রস্তাব দেন, যাতে দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী জেলেরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা সুবিধা সহজে পেতে পারেন। এছাড়াও তিনি জেলেদের নিয়ে সেলফ হেল্প গ্রুপ (Self Help Group) গঠনের পরামর্শ দেন, যাতে দলভিত্তিক সঞ্চয়, ক্ষুদ্র ঋণ, আয়বর্ধক কার্যক্রম এবং বিকল্প জীবিকা কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়।

সভায় আরও আলোচনা হয় যে, এডিপি (ADP) খাতের মাধ্যমে জেলেদের চাহিদাভিত্তিক সহায়তা প্রদান করা হলে তা সিএমসি কমিটির তত্ত্বাবধানে গ্রুপভিত্তিকভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। সম্ভাব্য সহায়তার মধ্যে ভ্যান প্রদান, লবণ-সহনশীল বীজ বিতরণ, মৌচাক ও মধু প্যাকেজিং মেশিন সরবরাহ, কাঁকড়া ব্যবসার সহায়তা, ভ্রাম্যমাণ পানির ব্যবসা এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। এতে জেলেরা সংগঠিতভাবে বিকল্প কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন এবং তাদের আয় বৃদ্ধি পাবে।

মুক্ত আলোচনায় উপস্থিত জেলে প্রতিনিধি রেজাউল ইসলাম বলেন, “তিন মাস পাস বন্ধ থাকার সময় যদি আমরা কাঁকড়ার ব্যবসা, চাল কুড়ার ব্যবসা বা অন্য কোনো ছোট ব্যবসা করার সুযোগ ও সহায়তা পাই, তাহলে আমরা আমাদের পরিবার নিয়ে ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারবো এবং বন ও নদীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে সক্ষম হবো।” তাঁর এই বক্তব্য সভায় উপস্থিত অন্যান্য জেলেদের মধ্যেও ব্যাপক সমর্থন লাভ করে।

সভার সমাপনী বক্তব্যে বন বিভাগের কর্মকর্তারা জেলেদের সব মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন। তারা জানান, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, বিএলসি কার্ড নবায়ন এবং জীবিকা উন্নয়নের বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে এডিপি খাতের মাধ্যমে জেলেদের চাহিদাভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করা হয়।

সর্বোপরি, মতবিনিময় সভাটি বন বিভাগ, সিএমসি কমিটি, স্থানীয় জেলে সম্প্রদায় এবং CEDIO-এর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সমন্বয় ও সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অংশগ্রহণকারীরা আশা প্রকাশ করেন যে, এই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে যেমন সুন্দরবনে কীটনাশক দিয়ে মাছ ধরা হ্রাস পাবে, অন্যদিকে জেলেদের জন্য টেকসই বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা তাদের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক অবদান রাখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *